Please wait

Published on 1/2/2026

বিশাল কৃষিজমি ও দারিদ্র্যের প্যারাডক্স: বাংলাদেশ কি আসলেই কৃষিতে সমৃদ্ধ?
সম্প্রতি ‘অ্যামেজিং ম্যাপস’ (Amazing Maps) প্রকাশিত একটি মানচিত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র দেশ যার মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশেরও বেশি জমি চাষযোগ্য। ভারত (৫২.৮%), ইউক্রেন (৫৬.৮%) বা যুক্তরাষ্ট্রের (১৭.২%) মতো কৃষি পরাশক্তিগুলোর চেয়েও এই হার অনেক বেশি। আপাতদৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল আশীর্বাদ মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা হলো—কেবল উর্বর মাটি থাকলেই একটি দেশ ধনী হতে পারে না।
মানচিত্রে আমরা যে ৬০% দেখছি, তা কেবল দেশের মোট আয়তনের অনুপাতে। কিন্তু বাস্তব সংখ্যাটি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৬৮ গুণ বড়। তাদের মাত্র ১৭% জমি চাষযোগ্য হলেও, তার মোট পরিমাণ বাংলাদেশের মোট জমির চেয়ে বহুগুণ বেশি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান হলো মাথাপিছু আবাদি জমি (Arable Land Per Capita)।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে একজন মানুষের ভাগে মাত্র ০.০৫ হেক্টর চাষযোগ্য জমি পড়ে (World Bank, 2023)।
তুলনামূলকভাবে, ভারতে এটি ০.১১ হেক্টর এবং রাশিয়ায় ০.৮৫ হেক্টর।অর্থাৎ, আমাদের মাটির প্রতিটি ইঞ্চি উর্বর হলেও, বিশাল জনসংখ্যার ভারে মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এই সামান্য জমি দিয়ে একজন কৃষকের পক্ষে কেবল নিজের পরিবারের অন্ন সংস্থান করাই কঠিন, সেখানে বাণিজ্যিক মুনাফা করা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হলো ‘জমির খণ্ডবিখণ্ডতা’ (Land Fragmentation)। উত্তরাধিকার আইনের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জমি ভাগ হতে হতে এখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্লটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ৮৮.৫% কৃষি খামারের আয়তন ১.০ হেক্টরের নিচে (BBS, 2022)।
এত ছোট জমিতে আধুনিক ট্রাক্টর, হারভেস্টার বা উন্নত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। উন্নত বিশ্বে হাজার একর জমিতে একজন কৃষক সব কাজ যন্ত্র দিয়ে করেন, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনে। বাংলাদেশে সনাতন পদ্ধতির কারণে উৎপাদন খরচ বেশি, কিন্তু লাভের হার কম।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫% কৃষিকাজে নিয়োজিত, কিন্তু জিডিপিতে (GDP) কৃষির অবদান মাত্র ১১-১২%।এর অর্থ হলো, যে কাজ ১০ জন মানুষ করতে পারে, সেখানে ২০ জন মানুষ নিয়োজিত আছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ছদ্মবেশী বেকারত্ব’। কৃষি খাতে এই অতিরিক্ত শ্রমশক্তি কোনো বাড়তি উৎপাদন যোগ করছে না, বরং মাথাপিছু আয় কমিয়ে দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলো তাদের জনসংখ্যাকে কৃষি থেকে সরিয়ে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে স্থানান্তর করেছে, যা বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি করতে পারেনি।
নেদারল্যান্ডস বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিলিয়ন ডলার আয় করে। তারা আলু বিক্রি করে না, চিপস বিক্রি করে; টমেটো বিক্রি করে না, সস বিক্রি করে।বাংলাদেশে আমরা মূলত কাঁচামাল (Raw Material) উৎপাদন ও বিক্রি করি।
পর্যাপ্ত হিমাগার (Cold Storage) ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের অভাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০-৪০% ফল ও সবজি নষ্ট হয় (Post-harvest loss)।
কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে, ফলে কৃষি তার কাছে কেবল ‘বেঁচে থাকার সংগ্রাম’ হয়ে দাঁড়ায়, ‘বাণিজ্য’ হতে পারে না।
বাংলাদেশের ডেল্টা বা বদ্বীপ প্রকৃতি কৃষির জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও। প্রতি বছর বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় হাজার হাজার একর ফসলি জমি নষ্ট করে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে একসময়ের উর্বর জমি এখন চাষের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। এই অনিশ্চয়তা কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে।
তবে সবশেষে বলা যায়, বিশ্বের সর্বাধিক চাষযোগ্য জমির মালিক হওয়া বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গর্বের। কিন্তু এই সম্পদকে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে আমাদের সনাতন কৃষি থেকে বেরিয়ে ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার’ বা বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ঝুঁকতে হবে। জমির সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদ (Cooperative Farming), কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই হতে পারে এই দারিদ্র্য থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
References
Related Tags: